আমালসাওম

রমাজানের দশটি আমালঃ রমাজান কিভাবে কাটাবো! পর্ব ১

363 বার পড়া হয়েছে।
সওম (রোজা) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
কুরআন তিলাওয়াত বেশি বেশি মাছজিদে অবস্থান
কিয়ামঃ তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ ই’তিকাফ
বেশি বেশি দু’আ, যিকির ও ইসতিগফার কদর তালাশ করা
দান সদকা সম্ভব হলে রমাজানে ওমরা করা

 

(এক) সওম। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (183) أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ فَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ (184) شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (البقرة 185)

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পারো। নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে সওম পূর্ণ করে নিতে হবে। আর এটা যাদের জন্য কষ্টদায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্য দান করবে।  যে ব্যক্তি খুশির সাথে নেক কাজ করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি সওম পালন কর, তবে তোমাদের জন্য বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার।  রমাদান মাসই হল সেই মাস যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন। যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের যে ব্যক্তি এই মাসটি পাবে, সে এ মাসে সিয়াম পালন করবে।  আর যে ব্যক্তি অসুস্থ বা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে এ সংখ্যা পূরণ করবে।  আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা (রোজার) নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ করে নিতে পার এবং তোমাদের হিদায়াত দান করার দরুন আল্লাহ তায়ালার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর। (সূরা বাকারাহ, আয়াত নং ১৮৩,১৮৪,১৮৫)

1904 – حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُوسَى، أَخْبَرَنَا هِشَامُ بْنُ يُوسُفَ، عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، قَالَ: أَخْبَرَنِي عَطَاءٌ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ الزَّيَّاتِ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” قَالَ اللَّهُ: كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ، إِلَّا الصِّيَامَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ، وَالصِّيَامُ جُنَّةٌ، وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفُثْ وَلاَ يَصْخَبْ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ، فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ ” «وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ المِسْكِ» ” لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا: إِذَا أَفْطَرَ فَرِحَ، وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ ” — البخارى

হযরত আবু সালীহ র. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.)কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, সওম ব্যতীত বনী আদমের সকল কাজই তার নিজের জন্যে, কিন্তু সিয়াম আমার জন্যে। আর আমি এর প্রতিদান দেব। সিয়াম (রোজা) ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন সিয়াম পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা ঝগড়া বিবাদ করে তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন সায়িম (রোজাদার)।

যার কব্জায় মুহাম্মাদ (স.) এর জান তার শপথ! অবশ্যই সায়িমের মুখের গন্ধ আল্লাহ তায়ালার নিকট মেশকের গন্ধের চেয়েও সুগন্ধ। সায়িমের জন্যে রয়েছে দু’টি পুরষ্কার (খুশি)। যখন সে ইফতার করে আর যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাত করবে, তখন সওমের পুরষ্কারে আনন্দিত হবে।  (বুখারী শরীফ, হাদীছ নং ১৯০৪)

7538 – حَدَّثَنَا آدَمُ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ زِيَادٍ، قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْوِيهِ عَنْ رَبِّكُمْ، قَالَ: «لِكُلِّ عَمَلٍ كَفَّارَةٌ، وَالصَّوْمُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ، وَلَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ المِسْكِ» — البخارى

হযরত মুহাম্মাদ ইবনে যিয়াদ বলেন আমি হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.)কে রসূলুল্লাহর (স.) কাছ থেকে তোমাদের রব থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি তিনি বলেন, প্রতিটি আমলের কাফফারা রয়েছে (সে সব আমলের ত্রুটি দুর করার জন্যে) কিন্তু সওম আমার জন্যই, (এতে লোক দেখানোর কিছু নেই) তাই আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। সওম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তায়ালার কাছে মেশকের চেয়েও সুগন্ধময়। (বুখারী শরীফ, হাদীছ নং ৭৫৩৮)

38 – حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلاَمٍ، قَالَ: أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ فُضَيْلٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَامَ رَمَضَانَ، إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ» — البخارى

হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমাদানের সওম পালন করে, তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (বুখারী শরীফ, হাদীছ নং ৩৮)

# নিঃসন্দেহে সায়িমের (রোজাদার) জন্যে রয়েছে  এই অসীম ও অফুরন্ত সওয়াব। কিন্তু সায়িম যদি শুধুমাত্র খাদ্য ও পানাহার থেকে বিরত থাকে তবে এই মহান সওয়াব অর্জন করতে পারবে না। বরং পূর্ণ সওয়াব পেতে গেলে তাকে কিছু বিষয় বর্জন, কিছু বিষয় অর্জন করতে হবে।  যেমন রসূলুল্লাহ (স.) বলেন,

1903 – حَدَّثَنَا آدَمُ بْنُ أَبِي إِيَاسٍ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، حَدَّثَنَا سَعِيدٌ المَقْبُرِيُّ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالعَمَلَ بِهِ، فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ» — البخارى

হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ছেড়ে দেয়নি এবং সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তার খানা পিনা পরিত্যাগ করায় আল্লাহ তায়ালার কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী শরীফ, হাদীছ নং ১৯০৪)

“আল্লাহ তায়ালার কোন প্রয়োজন নেই” এই কথার অর্থ হল, এই ধরণের সায়িমের প্রতি আল্লাহ তায়ালা রহমাতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না এবং তা কবুল করবেন না।  (মুসতাফা আলবুগা)

6057 – حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، عَنِ المَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالعَمَلَ بِهِ وَالجَهْلَ ، فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ» قَالَ أَحْمَدُ: أَفْهَمَنِي رَجُلٌ إِسْنَادَهُ — البخارى

  হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ছেড়ে দেয়নি এবং সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি এবং মূর্খতা ছাড়েনি, তার খানা পিনা পরিত্যাগ করায় আল্লাহ তায়ালার কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী শরীফ, হাদীছ নং ১৯০৪)

1691 – حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الصَّبَّاحِ قَالَ: أَنْبَأَنَا جَرِيرٌ، عَنِ الْأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ، فَلَا يَرْفُثْ، وَلَا يَجْهَلْ، وَإِنْ جَهِلَ عَلَيْهِ أَحَدٌ، فَلْيَقُلْ: إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ ” — ابن ماجة

হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন সিয়াম অবস্থায় অশ্লীল ও মূর্খতাসুলভ আচরণ না করে। কেউ তার সাথে মূর্খতাসুলভ আচরণ করলে সে যেন বলে, আমি একজন সায়িম। (ইবনে মাজাহ, হাদীছ নং ১৬৯১)

আলবানীর তাহকীকঃ হাদীছটি সহীহ।

“সিয়াম অবস্থায় অশ্লীল ও মূর্খতাসুলভ আচরণ না করে” অর্থাৎ সে কথা ও আচরণে অশ্লীলতা না করে । আর শরীয়ত যাদের মূর্খ বলে তাদের মত কাজ কারবার করে না। “সে যেন বলে, আমি একজন সায়িম” অর্থাৎ সে যেন নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমি একজন সায়িম।  কাজেই প্রতিপক্ষের মত আমারও আচরণ করা ঠিক হবে না।  অথবা সে মুখ দিয়েই প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দিবে যে, আমি একজন সায়িম।  (মুহাম্মাদ ফুয়াদ আবদুল বাকী)

এক কথায় সায়িমের চোখ, কান, মুখসহ সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গে যেন সওমের সাক্ষ্য থাকে। এমন না হয়, পেট সিয়াম পালন করে, লজ্জাস্থান সিয়াম পালন করে, কিন্তু কান, চোখ বা অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সিয়াম পালন করে না। তাদের ব্যবহার অন্য সময়ও যেমন সিয়ামরত অবস্থায়ও তেমন। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে এই রমাদান থেকে আমরা এটাও নিয়ত করব যে, বাকী এগারটি মাসও আমরা এই রমাদানের মতই অতিবাহিত করব। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করেন। আমীন।

(দুই) কুরআন তিলাওয়াত

কুরআন তিলাওয়াত হুজুরে আকরাম (স.) এর বিশেষ আমল যা তিনি কোন একদিনের জন্যও ত্যাগ করেন নি। কুরআন প্রতিদিন তিলাওয়াতের জন্য। যেহেতু রমাদান মাসে কুরআন নাযিল হয়েছিল এই জন্য আমাদের যাদের পূর্ব থেকে কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস নেই তারা এই মাস থেকেই কুরআন শেখা, বোঝা ও তিলাওয়াত করার অভ্যাস গড়ে তুলি।

কুরআন সম্পর্কে কয়েকটি অবহিতি।

কুরআন কখন নাযিল হয়েছে?

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ

রমাদান মাস হল সে মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্য পথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।  (সূরা বাকারাহ, আয়াত নং ১৮৫)

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ (1)

আমি একে (কুরআনকে) কদরের রাতে নাযিল করেছি।  (সূরা ক্বদর, আয়াত নং ১)

কুরআন কিভাবে নাযিল হয়েছে?

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ تَنْزِيلًا (الانسان\الدهر 23)

আমি আপনার প্রতি পর্যায়ক্রমে কুরআন নাযিল করেছি।  (সূরা ইনসান/দাহর, আয়াত নং ২৩)

إنا نحن نَزَّلْنا عليك -أيها الرسول- القرآن تنزيلا من عندنا؛ لتذكر الناس بما فيه من الوعد والوعيد والثواب والعقاب.

হে রসূল আমি আপনার কাছে আমার পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে কুরআনকে নাযিল করেছি। এর মধ্যে মানুষের সৌভাগ্য- দূর্ভাগ্য, সাওয়াব ও শাস্তির বিষয়কে উল্লেখ করা হয়েছে।  (তাফছীরে মুয়াচ্ছার)

কুরআনের সঠিকতা

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ (2)

ইহা এমন এক কিতাব যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই, ইহাতে আছে মুত্তাকীনদের জন্যে হিদায়াত।  (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২)

কুরআন কোথায় ছিল কিভাবে ছিল?

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ (21) فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ (البروج 22)

বরং ইহা মহান কুরআন (২১) লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ (২২) {সূরা বুরুজ)

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ (77) فِي كِتَابٍ مَكْنُونٍ (78)

নিশ্চয়ই এটা সম্মানিত কুরআন।  যা আছে এক গোপন কিতাবে। (সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত নং ৭৭,৭৮)

কুরআনের সংরক্ষক কে?

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ (9)

আমিই কুরআন (যিকির) নাযিল  করেছি এবং নিজেই এর সংরক্ষক। (সূরা হিজর, আয়াত নং ৯)

তাফছীরে মুয়াচ্ছারঃ

إنَّا نحن نزَّلنا القرآن على النبي محمد صلى الله عليه وسلم، وإنَّا نتعهد بحفظه مِن أن يُزاد فيه أو يُنْقَص منه، أو يضيع منه شيء.

নিশ্চয়ই আমি মুহাম্মাদ (স.) এর উপর কুরআন নাযিল করেছি এবং আমি অঙ্গীকার করেছি যে, আমি এই কুরআনকে বাড়ানো, কমানো এবং তার মধ্য থেকে কোন কিছুকে নষ্ট করা থেকে সংরক্ষণ করব।  (তাফছীরে মুয়াচ্ছার)

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

سَنُقْرِئُكَ فَلاَ تَنْسَى إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ (الأعلى 6)

আমি আপনাকে পাঠ করাতে থাকবো, ফলে আপনি ভুলে যাবেন না।  (সূরা আ’লা, আয়াত নং ৬)

কুরআন স্পর্শ করার আদব

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ (79) تَنْزِيلٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ (80)

যারা পাক পবিত্র তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না। এটা বিশ্ব পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। (সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত নং ৭৯,৮০)

لا يَمَسُّ القرآن إلا الملائكة الكرام الذين طهرهم الله من الآفات والذنوب، ولا يَمَسُّه أيضًا إلا المتطهرون من الشرك والجنابة والحدث

এই কুরআনকে সম্মানিত ফেরেশতা যারা বিভিন্ন প্রকার আফাত ও নাপাকি থেকে পবিত্র তারা ব্যতীত কেউ স্পর্শ করবে না।  অনুরূপভাবে যে সকল লোক শিরক, ছোট ও বড় নাপাকি থেকে পবিত্র নয় তারাও স্পর্শ করবে না।  (তাফছীরে মুয়াচ্ছার)

কুরআন পাঠ করার নির্দেশ

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (1) خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ (2) اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ (3) الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ (4) عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ (5)

পাঠ করুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন আপনার রব মহা দয়ালু।  যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।  শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (সূরা আলাক, আয়াত নং ১,২,৩,৪,৫)

এই আয়াতে বলা হয়েছে, “আপনি পাঠ করুন”।  কিন্তু কী পাঠ করতে হবে তা বলা হয়নি।  এরপর বলা হয়েছে, “যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন” এখানেও কী শিক্ষা দিয়েছেন তা একেবারেই অস্পষ্ট। এরপর বলা হয়েছে “তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে ঐ বিষয় যা সে জানত না”  এখানেও কিন্তু বিষয়বস্তু অস্পষ্ট।  কারণ “যা সে জানত না” সেটাতো সুনির্দিষ্ট বিষয় নয়।  কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সূরা আর রহমান এর প্রথমেই সেই বিষয়বস্তু বলে দিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

الرَّحْمَنُ (1) عَلَّمَ الْقُرْآنَ (2)

মহা দয়ালু (আল্লাহ) যিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন।  (আর রহমান, আয়াত নং ১,২)

# এই দুই আয়াতের সমন্বয়ে এই কথা বলা যায় আপনি আপনার রবের নামে কুরআন পাঠ করুন। এখান থেকে আরো একটি বিষয় আমাদের বুঝতে হবে যে, অন্য বিদ্যা শিক্ষার ক্ষেত্রে এই আয়াত তিলাওয়াত করা ঠিক নয়।  অন্যবিদ্যা শিক্ষা করা জায়িয কিনা সেটা আলাদা বিষয়। এই আয়াত তিলাওয়াত করে ঐ বিদ্যাগুলোকে অস্বীকার করাও ঠিক নয়।  আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

কুরআন পাঠ করার আদব

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ (النحل 98)

অতঃপর আপনি যখন কুরআন তিলাওয়াত করবেন, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন।  (সূরা নাহল, আয়াত নং ৯৮)

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا (المزمل 4)

আর আপনি কুরআন তিলাওয়াত করুন সুবিন্যস্ত ভাবে ও স্পষ্টভাবে।  (সূরা মুযামমিল, আয়াত নং ৪)

واقرأ القرآن بتُؤَدَة وتمهُّلٍ مبيِّنًا الحروف والوقوف.

আপনি কুরআনকে ধীরস্থীরতা, স্পষ্ট হারফ উচ্চারণ ও সঠিক পদ্ধতিতে ওয়াকফের সাথে তিলাওয়াত করুন।  (তাফছীরে মুয়াচ্ছার)

কুরআন শোনার আদব

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (الأعراف 204)

আর যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা তাতে কান লাগিয়ে শোনো এবং নিশ্চুপ থাক যাতে তোমরা রহমাত প্রাপ্ত হও।  (সূরা আ’রাফ, আয়াত নং ২০৪)

কুরআন তিলাওয়াত, ইয়াদ ও বোঝার উপায়

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ (القمر 17)

আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য।  অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?  (সূরা ক্বমার, আয়াত নং ১৭)

ولقد سَهَّلْنا لحفظ القرآن للتلاوة والحفظ، ومعانيه للفهم والتدبر، لمن أراد أن يتذكر ويعتبر، فهل من متعظ به؟

# যে কুরআনকে বুঝতে চায়, স্মরণ করতে চায়, বিবেচনা করতে চায় তার জন্য আমি কুরআনকে তিলাওয়াতের জন্য, হিফজ করার জন্য, বোঝার জন্য ও তা নিয়ে চিন্তা গবেষণার জন্য সহজ করে দিয়েছি।  সুতরাং এই উপদেশ পালনকারী কি কেউ আছে? (তাফছীরে মুয়াচ্ছার)

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ (16) إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآَنَهُ (17) فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآَنَهُ (18) ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ (19)

তাড়াতাড়ি শিখে নেওয়ার জন্যে আপনি দ্রুত ওহী আবৃত্তি করবেন না।  এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমারই দায়িত্বে।  অতঃপর আমি যখন তা পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন।   এরপর বিশদ বর্ণনা আমারই দায়িত্বে।  (সূরা কিয়ামাহ, আয়াত নং ১৬,১৭,১৮,১৯)

لا تحرك -أيها النبي- بالقرآن لسانك حين نزول الوحي؛ لأجل أن تتعجل بحفظه، مخافة أن يتفلَّت منك. إن علينا جَمْعه في صدرك، ثم أن تقرأه بلسانك متى شئت. فإذا قرأه عليك رسولنا جبريل فاستمِعْ لقراءته وأنصت له، ثم اقرأه كما أقرأك إياه، ثم إن علينا توضيح ما أشكل عليك فهمه من معانيه وأحكامه.

হে নবী যখন কুরআন নাযিল হয় তখন আপনি দ্রুত হিফজ করার জন্য ভুলে যাওয়ার ভয়ে জিহবাকে সঞ্চালন করবেন না।  আপনার ছিনায় সংরক্ষণের দায়িত্ব আমার। আপনি যখন তিলাওয়াত করতে চান তিলাওয়াত করানোর দায়িত্বও আমার। কাজেই যখন আমার ফেরেশতা জীবরীল আপনাকে কুরআন শোনান তখন আপনি চুপ থাকুন ও মনোযোগ সহকারে শুনুন। এরপর জীবরীল যেভাবে আপনাকে শুনিয়েছে আপনিও সেভাবে শোনান। অতঃপর কুরআনের অর্থ ও হুকুম আহকাম বুঝতে যেখানে মুশকিল হয় সেটা স্পষ্ট করার দায়িত্বও আমার।  (তাফছীরে মুয়াচ্ছার)

# দুনিয়ার কোন কিতাব নেই, যে কিতাব সম্পর্কে এতগুলো সত্যায়ণ বা শর্তাদী আছে যা আছে কুরআন সম্পর্কে। অথচ এই মহান কিতাব সম্পর্কে আমরা অধিকাংশই বেখবর।  আমাদের মনে কি চায় না, অন্যান্য কিতাবের মত এই কিতাবটিও একটু পড়ার, জানার বা শেখার সিলেবাসে রাখি!

রমাদান মাস হল কুরআন নাযিলের মাস। এই পবিত্র কিতাব, মহান মানবের উপর মহান ফেরেশতার মাধ্যমে সবচেয়ে সম্মানিত স্থানে সবচেয়ে মারতাবা পূর্ণ মাসে নাযিল হয়।  আমাদের জন্যে বড় আফছোছ! দুনিয়ার অনেক কিছুই জানি অথচ এই পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত টুকুও জানি না। ইংরেজী অংক না জানলে সমাজে তাকে মূর্খ বলা হয় কিন্তু কুরআন না জানলে কাউকে মূর্খ বলা হয় না! এগুলো শিখতে নিষেধ নেই তবে কথা হল, এগুলো শিক্ষা করা ফরয নয় কিন্তু কুরআন শিক্ষা করা ফরয।  ইংরেজী অংক না জানলে কিয়ামাতে জিজ্ঞাসা করা হবে না কিন্তু কুরআন না জানলে তাকে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে। তাই সকলের প্রতি আহবান, আসেন! সবাই মিলে কুরআনকে শিখি। কুরআন নাযিলের এই মাসে কুরআন শিক্ষার জন্য চেষ্টা করি। যদি চেষ্টা করার পর শুধুমাত্র কয়টি হারফও সহীহভাবে শিখতে পারি তবে সেটাও কম নয়।  এই উদ্যোগ, এই প্রচেষ্টা আমার আপনার নাজাতের জন্যে যথেষ্ট হতে পারে।

আমরা কুরআনকে তিনটি স্তরে শিখতে পারি।

(এক) যারা আরবী হারফই জানি না। তারা কমপক্ষে হারফগুলো শুদ্ধভাবে শিখি।

(দুই) যারা কুরআন তিলাওয়াত করতে পারি কিন্তু সহীহভাবে পারি না, তারা চেষ্টা করি কোন ক্বারী আলিমের কাছে যেয়ে সহীহভাবে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা করার।  আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا (المزمل 4)

আর আপনি কুরআন তিলাওয়াত করুন সুবিন্যস্ত ভাবে ও স্পষ্টভাবে। (সূরা মুযামমিল, আয়াত নং ৪)

অর্থাৎ আপনি কুরআনকে ধীরস্থীরতা, স্পষ্ট হারফ উচ্চারণ ও সঠিক পদ্ধতিতে ওয়াকফের সাথে তিলাওয়াত করুন।  (তাফছীরে মুয়াচ্ছার)

(তিন) যারা সহীহ ভাবে তিলাওয়াত করতে পারি তারা কুরআনকে ইয়াদ করার চেষ্টা করি। এই মাসেই ইয়াদ হয়ে যাবে এমন না কিন্তু শুরু করার উদ্যেগ নিতে পারি। এর সাথে সাথে কুরআনকে বোঝারও চেষ্টা করি। যারা কিছু আরবী ব্যাকরণ জানি তারা পুরা মাস চেষ্টা করি কুরআন বোঝার। এখানে মনে রাখি এক মাসের মধ্যেই এই কাজটি সমাধা না হলেও কমপক্ষে শুরুটা করি।  পূর্ণ করার মালিক আল্লাহ।

রমাদান মাসে এই কাজগুলো বেশি বেশি করার চেষ্টা করি। এরপর নিজেও খতম করি এবং বার বার করি সাথে সাথে অপরের কাছ থেকে কমপক্ষে একবার পুরা কুরআন শোনার চেষ্টা করি। এর জন্য সহজ হয়, যেখানে তারাবীতে কুরআন খতম করা হয় সেখানে তারাবীর সালাত আদায় করা।  হযরত জীবরীল (আ.) রমাদানে হুজুরে আকরাম (স.)কে পুরা কুরআন শুনাতেন।

রমাদানে আল্লাহ ওয়ালাদের আমালঃ

হযরত উছমান (রা.) প্রতিদিন এক খতম করে তিলাওয়াত করতেন। হযরত ইমাম শাফী (র.) রমাদানে সালাতের বাইরে ষাটবার কুরআন খতম করতেন। হযরত আছওয়াদ (র.) প্রতি দুই রাতে একবার কুরআন খতম করতেন।  হযরত যুহরী (র.) রমাদানের শুরুতে সকলের থেকে পৃথক হয়ে যেতেন। এমনকি আলিমদের মাজলিছ থেকেও পৃথক হয়ে যেতেন। শুধু কুরআন তিলাওয়াতকে বেছে নিতেন। হযরত ছুফইয়ান ছাউরী (র.) রমাদানে সকল নফল ইবাদাত ছেড়ে দিয়ে শুধু কুরআন তিলাওয়াত করতেন।

# উলামা হযরতগণ তিন দিনের কম কুরআন খতম করতে নিষেধ করেছেন। এটা নিয়মিতভাবে সারা বছরের জন্যে। কিন্তু বিশেষ সময়ে বিশেষ ফাজিলাতে এটা নিষিদ্ধ নয়। আল্লাহই সর্ববিষয়ে অধিক জ্ঞাত।

(তিন) কিয়ামঃ তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا (63) وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا (64) [الفرقان 63 ـ 64]

রহমানের বান্দা তারাই যারা যমীনে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলে, সালাম।  এবং যারা রাত্র যাপন করে রবের উদ্দেশ্যে ছিজদাবনত হয়ে ও দন্ডয়মান হয়ে।

(সূরা ফুরক্বন, আয়াত নং ৬৩,৬৪)

রসূলুল্লাহ (স.) বলেন,

1307 – حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ يَزِيدَ بْنِ خُمَيْرٍ، قَالَ: سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ أَبِي قَيْسٍ، يَقُولُ: قَالَتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: «لَا تَدَعْ قِيَامَ اللَّيْلِ ‍ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ لَا يَدَعُهُ، وَكَانَ إِذَا مَرِضَ، أَوْ كَسِلَ، صَلَّى قَاعِدًا» — ابو داود

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি কায়িস (র.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত আয়িশা (রা.) বলেছেন, তুমি রাতের কিয়াম ছেড়ে দিবে না। কারণ রসূলুল্লাহ (স.) কখনও একে ছেড়ে দেননি। তিনি (স.) অসুস্থ হলে কিংবা অলসতাবোধ করলে বসে সালাত আদায় করতেন। (আবু দাউদ, হাদীছ নং ১৩০৭)

আলবানীর তাহকীকঃ হাদীছটি সহীহ।

389 – مَالِكٌ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنْ أَبِيهِ؛ أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ كَانَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ مَا شَاءَ اللهُ. حَتَّى إِذَا كَانَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ، أَيْقَظَ أَهْلَهُ لِلصَّلاَةِ. يَقُولُ لَهُمُ: الصَّلاَةَ، الصَّلاَةَ. ثُمَّ يَتْلُو هذِهِ الآيَةَ: {وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَوةِ وَاِصْطَبِرْ عَلَيْهَا لا نَسئَلُكَ رِزْقاً نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى} [طه 20: 132].— موطأ مالك
হযরত যায়িদ ইবনে আছলাম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত ওমার ইবনে খত্তাব (রা.) আল্লাহ তায়ালা যতটুকু চাইতেন রাতে সালাত আদায় করতেন। এরপর শেষ রাতে সালাত আদায়ের জন্য তার পরিবার পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন। তাদেরকে বলতেন, “সালাত, সালাত ” এরপর এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন

 {وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَوةِ وَاِصْطَبِرْ عَلَيْهَا لا نَسئَلُكَ رِزْقاً نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى} [طه 20: 132]

আপনি আপনার পরিবারের লোকদেরকে সালাতের আদেশ দিন এবং নিজেও এর উপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোন রিযিক চাই না। আমিই আপনাকে রিযিক দান করি এবং মুত্তাকীদের (গোনাহ থেকে যারা বেঁচে থাকে) পরিণাম শুভ। (সূরা ত্বহা, আয়াত নং ১৩২) {মুআত্তায়ে মালিক}

“সালাত, সালাত ” : সালাতের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।  সালাতকে আবশ্যক মনে করো।

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ مُوسَى الْبَابَسِيرِيُّ، ثَنَا عُمَرُ بْنُ الْحَسَنِ، ثَنَا ابْنُ شَبَّةَ، ثَنَا أَبُو خَلَفٍ صَاحِبُ الْحَرِيرِ، عَنْ يَحْيَى الْبَكَّاءِ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ: ” {أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ} [الزمر: 9] قَالَ: هُوَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ ” — حلية الاولياء و طبقات الاصفياء

হযরত ইবনে ওমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতে ছিজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদাত করে, পরকালের আশংকা রাখে, এবং তার পালনকর্তার রহমাতের আশা রাখে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না; বলেন, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান”(যুমার, ৯) এখানে “যে ব্যক্তি” হল হযরত উছমান (রা.) ।

রসূলুল্লাহ (স.) বলেন,

37 – حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ: حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ حُمَيْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ» — البخارى

হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন হযরত রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমাদানের রাতে ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করে তার পূর্বের গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (বুখারী শরীফ, হাদীছ নং ৩৭)

“قَامَ رَمَضَانَ” অর্থাৎ রাত জেগে ইবাদাত বন্দেগী করে। (মুসতাফা আলবুগা)

যদি কেউ পূর্ণ তারাবীহ আদায় করে, তবে সেও রাত জেগে ইবাদাত পালনকারী বলে গন্য হবে।  আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

হযরত রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন,

806 – حَدَّثَنَا هَنَّادٌ قَالَ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الفُضَيْلِ، عَنْ دَاوُدَ بْنِ أَبِي هِنْدٍ، عَنْ الوَلِيدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الجُرَشِيِّ، عَنْ جُبَيْرِ بْنِ نُفَيْرٍ، عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: صُمْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمْ يُصَلِّ بِنَا، حَتَّى بَقِيَ سَبْعٌ مِنَ الشَّهْرِ، فَقَامَ بِنَا حَتَّى ذَهَبَ ثُلُثُ اللَّيْلِ، ثُمَّ لَمْ يَقُمْ بِنَا فِي السَّادِسَةِ، وَقَامَ بِنَا فِي الخَامِسَةِ، حَتَّى ذَهَبَ شَطْرُ اللَّيْلِ، فَقُلْنَا لَهُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، لَوْ نَفَّلْتَنَا بَقِيَّةَ لَيْلَتِنَا هَذِهِ؟ فَقَالَ: «إِنَّهُ مَنْ قَامَ مَعَ الإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ كُتِبَ لَهُ قِيَامُ لَيْلَةٍ»، ثُمَّ لَمْ يُصَلِّ بِنَا حَتَّى بَقِيَ ثَلَاثٌ مِنَ الشَّهْرِ، وَصَلَّى بِنَا فِي الثَّالِثَةِ، وَدَعَا أَهْلَهُ وَنِسَاءَهُ، فَقَامَ بِنَا حَتَّى تَخَوَّفْنَا الفَلَاحَ، قُلْتُ لَهُ: وَمَا الفَلَاحُ، قَالَ: «السُّحُورُ»: «هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ» — الترمذى

হযরত আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুলুল্লাহ (স.) এর সাথে আমরা সওম পালন করেছি। তিনি আমাদেরকে নিয়ে রমাদান মাসে কোন নফল সালাত আদায় করেন নি।  অবশেষে তিনি রমাদানের সাত দিন বাকি থাকতে আমাদেরকে নিয়ে সালাতে দাঁড়ালেন। এতে রাতের তিনভাগের একভাগ অতিবাহিত হয়ে গেল। আমাদেরকে নিয়ে তিনি ষষ্ঠ রাতে সালাত আদায় করার জন্য দাঁড়ান নি।  তিনি পঞ্চম রাতে আমাদের নিয়ে আবার সালাত আদায় করার জন্য দাঁড়ান। এতে অর্ধেক রাত চলে গেল। আমরা তাঁকে বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ (স.) যদি আমাদের বাকি রাতটিও সালাত আদায় করে পার করে দিতেন! তিনি বললেনঃ ইমামের সাথে যদি কোন লোক (ফরয) সালাতে শামিল হয় এবং ইমামের সাথে সালাত আদায় শেষ করে তাহলে সে লোকের জন্য সারারাত নফল সালাত আদায় করার সাওয়াব লেখা হয়  এরপর মাসের তিন রাত বাকি থাকা পর্যন্ত তিনি আর আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করেন নি। আবার তিনি তৃতীয় রাত থাকতে (২৭ শে) আমাদের নিয়ে সালাতের জন্য দাঁড়ালেন। তাঁর পরিজন ও স্ত্রীদেরকেও তিনি এরাতে ডেকে তুললেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে সালাত আদায় করলেন যে, আমাদের মনে সংশয় হল যে, ফালাহ (সাহরী) খাওয়ার সময় চলে না যায়।  বর্ণনাকারী যুবাইর ইবনে নুফাইর বলেন, আবু বকরকে (রা.) আমি বললাম ফালাহ কী? তিনি বললেন, সাহরী খাওয়া (তিরমিযী, হাদীছ নং ৮০৬)

ইমাম তিরমিযী (র.) বলেন, হাদীছটি হাছান সহীহ।

অনুরূপভাবে কেউ যদি ফজরের সালাত ও ইশার সালাত জামায়াতের সাথে আদায় করে তবে সেও রাত জেগে ইবাদাত পালনকারী বলে গন্য হবে।  আল্লাহর রসূল (স.) বলেন,

260 – (656) حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، أَخْبَرَنَا الْمُغِيرَةُ بْنُ سَلَمَةَ الْمَخْزُومِيُّ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ وَهُوَ ابْنُ زِيَادٍ، حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ حَكِيمٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ أَبِي عَمْرَةَ، قَالَ: دَخَلَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ الْمَسْجِدَ بَعْدَ صَلَاةِ الْمَغْرِبِ، فَقَعَدَ وَحْدَهُ، فَقَعَدْتُ إِلَيْهِ فَقَالَ، يَا ابْنَ أَخِي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: «مَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا قَامَ نِصْفَ اللَّيْلِ، وَمَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا صَلَّى اللَّيْلَ كُلَّهُ»  — المسلم

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবি আমরাহ বর্ণনা করেন তিনি বলেন হযরত উছমান ইবনে আফফান (রা.) মাগরিবের পরে মাছজিদে প্রবেশ করেন। তিনি একাকী বসে ছিলেন। আমি তার পাশে বসলাম। এরপর তিনি বললেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি রসূলুল্লাহ (স.) কে বলতে শুনেছি, যে ইশার সালাত জামায়াতে আদায় করল সে যেন অর্ধরাত জেগে ইবাদাত করল আর যে ফজরের সালাত জামায়াতের সাথে আদায় করল সে যেন সারা রাত সালাত আদায় করল।  (মুছলিম)

মুছনাদে আহমাদ হাদীছ গ্রন্থে এই ফাজীলাতটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে,

408 – حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ. وَعَبْدُ الرَّزَّاقِ، قَالَ: أَخْبَرَنَا سُفْيَانُ، عَنْ عُثْمَانَ بْنِ حَكِيمٍ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي عَمْرَةَ عَنْ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ؛ قَالَ عَبْدُ الرَّزَّاقِ: عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ” مَنْ صَلَّى صَلاةَ الْعِشَاءِ وَالصُّبْحِ فِي جَمَاعَةٍ، فَهُوَ كَقِيَامِ لَيْلَةٍ “،(إسناده صحيح على شرط مسلم، رجاله ثقات رجال الشيخين غير عثمان بن حكيم) .— مسند احمد ط الرسالة

নবী কারীম (স.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যে ইশার সালাত ও ফজরের সালাত জামায়াতের সাথে আদায় করল সে যেন সারা রাত জেগে ইবাদাত করল। (মুছনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ৪০৮)

# হাদীছটির ইছনাদ সহীহ। মুছলিমের শর্তে উত্তীর্ণ। এই হাদীছের মধ্যে উছমান ইবনে হাকীম ব্যতীত সবাই মুছলিম ও বুখারীর রাবী।এই হাদীছের সকল রাবী ছিকাহ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Comment here