ছনদ ও কিছু কথাহাদিস

জয়ীফ হাদীছের পরিচয়, পরিধি ও হুকুম – পর্ব ১

2,008 বার পড়া হয়েছে।
بسم الله الرحمن الرحيم

বর্তমানে এক শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে যারা হাদীছের পরিশুদ্ধির নামে অনেক হাদীছকে হাদীছের ভাণ্ডার থেকে বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। ফলে আল্লাহর রসূল (স.) এর বহু হাদীছ ধ্বংসের মুখে অথবা ঘৃণার মুখে পড়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। জয়ীফ হাদীছ সম্পর্কেই তাদের যতসব আক্রোশ। এই শাখার ইমাম হিসাবে জনাব আলবানী সাহেব (র.) অগ্রগণ্য। হাদীছের মধ্যে থেকে জয়ীফ হাদীছকে পৃথক করে ভিন্ন আঙ্গিকে সুবিন্যস্ত করায় অনেকের মধ্যে বিশেষ করে জেনারেল শিক্ষিত ভাইদের মধ্যে এমন একটা ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, জয়ীফ মানেই হল “জাল, জয়ীফ ও বানোয়াট” হাদীছ। অথচ জয়ীফ হাদীছ হাদীছেরই একটা শ্রেণি। তবে তার হুকুম হল, জয়ীফ হাদীছ ঢালাওভাবে গ্রহনযোগ্যও নয় আবার ঢালাওভাবে প্রত্যাখানযোগ্যও নয়। বরং তার জন্য আছে অনেকগুলো শর্ত। শর্তাধীনে জয়ীফ হাদীছ গ্রহনযোগ্য আবার শর্তাধীনে জয়ীফ হাদীছ অগ্রহণযোগ্য। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে সহীহ, জয়ীফের পার্থক্য মাশহুদ যামানায় ছিল না। পরবর্তীতে ইয়াহুদ ও শিয়াদের চক্রান্ত থেকে নাবী কারীম (স.) এর মহা পবিত্র বাণীগুলোকে রক্ষার জন্য, সাধারণের কথা থেকে পৃথক করার জন্যই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। মনে রাখতে হবে যে মহা মনিষীগণ এই শ্রেণিবিভাগ করেছিলেন, তার সংজ্ঞা প্রদান করেছিলেন তারা এই হাদীছের হুকুমও বাতলে দিয়েছিলেন। আমাদের কর্তব্য হল যদি তাদের বর্ণিত হাদীছের শ্রেণিবিভাগের সংজ্ঞাগুলো আমরা গ্রহণ করি তবে তাদের নির্ধারিত এই সব হাদীছের হুকুমও গ্রহণ করতে হবে। যদি এমন হয় যে, সংজ্ঞা তাদের থেকে নিব আর হুকুম আমরা গ্রহণ করব তবে বিশৃঙ্খলা সদা সর্বদা লেগেই থাকবে। যা বর্তমানে পরিলক্ষিত হচ্ছে।  এই অজ্ঞতা থেকে বাঁচার জন্য আমাদের উচিত হবে জয়ীফ হাদীছ সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা থাকা। যেন হাদীছের নামে হাদীছ বহির্ভুত কথা হাদীছের ভাণ্ডারের মধ্যে প্রবেশ না করে আবার জয়ীফের দোহাই দিয়ে হাদীছ যেন হাদীছের ভাণ্ডার থেকে বের হয়ে না যায়। আল্লাহই সঠিক পথের দিশারী।

এবার কিছু পরিভাষা ও তার সংজ্ঞা ও হুকুম সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

প্রথমে মারদূদ সম্পর্কেঃ মারদূদ দুইভাবে হয়। (১) ছনদের ধারবাহিকতায় ছেদ, (২) রাবী সম্পর্কে কোন অপবাদ(১) ছনদের ধারবাহিকতায় ছেদঃছনদের মধ্যে কোন রাবী বাদ পড়া। এটা বিভিন্নভাবে হতে পারে। যেমন, একজন রাবী বাদ পড়া, একাধিক রাবী বাদ পড়া, প্রথম দিকে বাদ পড়া, শেষের দিকে বাদ পড়া, মাঝে বাদ পড়া। এই বাদ পড়াটা ইচ্ছা করেও হতে পারে আবার অনিচ্ছাকৃতভাবেও হতে পারে। এটা প্রকাশ্যও হতে পারে আবার খফী বা অপ্রকাশ্যও হতে পারে।

প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্যভাবে ছনদের মধ্যে ছেদ পড়াটা দুইভাবে বিভক্ত। প্রকাশ্যভাবে রাবী বাদ পড়াকে চারটি নামে অভিহিত করা হয়। (১) মুআল্লাক, (২) মুরছাল. (৩)মু‘দাল, (৪) মুনকাতি’

অপ্রকাশ্যভাবে রাবী বাদ পড়াকে দুই নামে অভিহিত করা হয়। (১) মুদাল্লাছ, (২) মুরছালে খফী। তাহলে প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্যভাবে ছনদ থেকে রাবী বাদ পড়াকে আমরা সম্মিলিতভাবে ছয়টি নামে চিনতে পারি। যথাঃ (১) মুআল্লাক, (২) মুরছাল. (৩) মু‘দাল, (৪) মুনকাতি’ (৫) মুদাল্লাছ, (৬) মুরছালে খফী।

এবার এর প্রত্যেকটির সংজ্ঞা ও হুকুম সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

প্রকাশ্যভাবে রাবী বাদ পড়া চার প্রকারঃ (১) মুআল্লাক (২) মুরছাল. (৩) মু’দাল, (৪) মুনকাতি’ (এক) মুআল্লাকঃ যে হাদীছের ছনদের মধ্যে রাবী বাদ পড়াটা প্রথম দিকে হয়েছে অর্থাৎ সাহাবীর পর এক বা একাধিক নাম বাদ পড়েছে তাকে মুআল্লাক বলে।  এর মধ্যে কয়েকটি অবস্থা হতে পারে।  যেমন, (ক) সকল ইছনাদকে বাদ দিয়ে এভাবে বলা যে, রসূলুল্লাহ (স.) এমন বলেছেন।  (খ) সাহাবা, অথবা সাহাবা- তাবিয়ী বাদে ছনদের মধ্যে সকল রাবীর নাম লোপ করা।

হুকুমঃ রাবীর হালত না জানার কারণে মুআল্লাক হাদীছ গ্রহণযোগ্য নয়।

(দুই) মুরছালঃ যে হাদীছের ছনদের মধ্যে রাবী বাদ পড়াটা শেষের দিকে হয়েছে অর্থাৎ সাহাবার (রা.) নামই বাদ পড়েছে এবং তাবিয়ী খোদ রসূলুল্লাহ (স.) এর নাম করে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন তাকে হাদীছে মুরছাল বলে।  এর অবস্থাটা এমন যেমন তাবিয়ী তিনি ছোট হোন আর বড় হোন তিনি বলছেন হযরত রসূলুল্লাহ (স.) এমন বলেছেন বা এমন করেছেন বা তার উপস্থিতিতে তিনি এমন করেছেন।  একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি অধিক পরিষ্কার হবে ইনশাআল্লাহ।  বুখারী ও মুছলিমের বর্ণনাঃ

5760وَعَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَضَى فِي الجَنِينِ يُقْتَلُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ بِغُرَّةٍ عَبْدٍ، أَوْ وَلِيدَةٍ، فَقَالَ الَّذِي قُضِيَ  عَلَيْهِ: كَيْفَ أَغْرَمُ مَا لاَ أَكَلَ وَلاَ شَرِبَ، وَلاَ نَطَقَ وَلاَ اسْتَهَلَّ، وَمِثْلُ ذَلِكَ يُطَلُّ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّمَا هَذَا مِنْ إِخْوَانِ الكُهَّانِ — البخارى

وحَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ رَافِعٍ، حَدَّثَنَا حُجَيْنُ بْنُ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ بَيْعِ الْمُزَابَنَةِ وَالْمُحَاقَلَةِ، ” وَالْمُزَابَنَةُ: أَنْ يُبَاعَ ثَمَرُ النَّخْلِ بِالتَّمْرِ، وَالْمُحَاقَلَةُ: أَنْ يُبَاعَ الزَّرْعُ بِالْقَمْحِ، وَاسْتِكْرَاءُ الْأَرْضِ بِالْقَمْحِ “— المسلم

যেমন এই হাদীছের মধ্যে হযরত ছায়ীদ ইবনে মুছাইয়্যিব (রহ.) তিনি কিবারে তাবিয়ীনদের অন্তর্ভুক্ত।  তিনি এই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন অথচ এখানে তার ও নবী কারীম (স.) এর মাঝে যে সাহাবা ছনদের মধ্যে ছিলেন তার নাম উল্লেখ নেই।  এটাতে শেষের দিকের রাবী বাদ পড়া বোঝায়।

হুকুমঃ  ইমামগণের মধ্যে হযরত ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম মালিক (র.) মুরছাল হাদীছকে নিঃসঙ্কোচে গ্রহণ করেছেন।  তাঁদের মতে তাবিয়ী তখনই সাহাবার নাম বাদ দিয়ে সরাসরি রসূলুল্লাহ (স.) এর নামে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন যখন তাঁর নিকট হাদীছটি নিঃসন্দেহে রসূলুল্লাহ (স.) এর হাদীছ বলেই সাব্যস্ত হয়েছে।  আর যারা এই হাদীছ গ্রহণ করতে আপত্তি করেছেন তাদের নিকট এই হাদীছটিতে ছনদের ধারাবাহিকতা নেই বলে আপত্তি করেছেন। তাদের নিকট এর মধ্যে দুটি জিনিস এসে গেছে।

(ক) রাবীর নাম না জানার কারণে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা।  (খ) তাবিয়ী যার থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন তিনি সাহাবী না তাবিয়ী সে সম্পর্কে অজ্ঞতা।

এই দু’টি অবস্থা সম্পর্কে কথা হল, সাহাবাগণের সম্পর্কে মিথ্যা বলা বা মিথ্যারোপের সম্ভবনা আসতেই পারে না।  সাহাবা এবং তাবিয়ীগণ সম্পর্কে নবী কারীম (স.) বলেন,

خَيْرُ القُرُوْنِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ.

আামর যামানা সর্বোত্তম অতঃপর উত্তম তার পরের যামানা অতঃপর তার পরের যামানা। তাছাড়া সাহাবারা সবাই ছিলেন ন্যায় পরায়ণ।  কাজেই তাদের হালত জানার কোন প্রয়োজন নেই। (চলবে ইনশাআল্লাহ)

“জয়ীফ হাদীছের পরিচয়, পরিধি ও হুকুম” পর্ব ২- পড়ার জন্য অনুরোধ রইল।

[…] ২য় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন […]

 

5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Yousuf
1 year ago

Khobi upokrito holam….

Nayeem
Nayeem
1 year ago

zajakallah

Comment here