কুরআনতাফছীর

কুরআনে অবতীর্ণ প্রথম পাঁচটি আয়াত ও আমাদের শিক্ষা

494 বার পড়া হয়েছে।

কুরআনে অবতীর্ণ প্রথম পাঁচটি আয়াত ও আমাদের শিক্ষা

আনুষাঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয়ঃ

আম্মাজান হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রসূলুল্লাহ (স.) এর প্রতি প্রথম অহীর সূচনা হয় সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে।  ঐ সময় তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন, তা সকালের আলোর মতই সুস্পষ্ট হত।  এরপর নিজর্ণতা তাঁর কাছে প্রিয় হয়ে উঠল।  তিনি হিরা গুহায় তাহান্নুছ করতেন। তাহান্নুছ হল বিশেষ এক প্রকার ইবাদাত। এ জন্য তিনি উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদিজা (রা.) এর নিকট থেকে কিছু খাদ্য পানীয় নিয়ে যেতেন এবং কয়েকদিন সেখানে ইবাদাত বন্দেগীতে কাটিয়ে দিতেন। এরপর আবার গৃহে প্রত্যাবর্তন করতেন এবং আবারো খাদ্য পানীয় নিয়ে (হিরায়) যেতেন। অতঃপর হিরা গুহায় থাকা অবস্থায় তাঁর কাছে সত্য এসে পৌঁছল। ফেরেশতা হযরত জীব্রাইল (আ.) (অহী নিয়ে) তাঁর কাছে এসে হাজির হলেন।

তিনি বলেন, “আপনি পড়েন”।  হযরত রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, আমি পড়তে জানি না।  তিনি (স.) বলেন, জীব্রাইল (আ.) আমাকে ধরে খুব জোরে আলিঙ্গন করলেন।  এটাতে আমি খুব কষ্ট অনুভব করলাম।  এরপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পাঠ করেন। এবারও আমি বললাম, আমি পড়তে জানি না।  হযরত রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, জীব্রাইল (আ.) আবার আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন।  এবারও আমি কষ্ট অনুভব করলাম।  তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন পড়েন।  আমি বললাম আমি পড়তে জানি না। জীব্রাইল (আ.) তৃতীয় বার আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। এটাতেও আমি ভীষণ কষ্ট অনুভব করলাম।  জীব্রাইল (আ.) আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “আপনি পাঠ করেন, আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন-সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড হতে। পাঠ করেন, আর আপনার রব বড় সম্মানিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন- শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না”।

রসূলুল্লাহ (স.) এই আয়াতগুলো নিয়ে ফিরে আসলেন।  এই সময় তাঁর কাঁধের গোশত ভয়ে থর থর করে কাঁপছিল।  ভীত হয়ে তিনি আম্মাজান হযরত খাদিজা (রা.) এর কাছে আসলেন এবং বললেন আমাকে চাদর মুড়িয়ে দাও, আমাকে চাদর মুড়িয়ে দাও।  তাঁকে  সবাই চাদর দিয়ে ঢেকে দিল।  কিছুক্ষণ পরে তাঁর ভয় কেটে গেল। তিনি খাদিজাকে (রা.) সব খুলে বললেন।  এটাও জানালেন যে, তিনি তাঁর জীবনের আশংকা করছেন।  হযরত খাদিজা (রা.) তাঁকে বললেন, কখনই নয়।  আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আল্লাহর কছম! আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না।  কারণ: (১) আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন অর্থাৎ আপনি আপনার আত্মীয় স্বজনের প্রতি কর্তব্য পালন করে থাকেন (২) সদা সত্য কথা বলেন (৩) অপরের বোঝা বহন করেন অর্থাৎ অনাথ, দূর্বলদেরকে সাহায্য করেন (৪) মেহমানের সেবা করেন (৫) সত্যের পথে অন্যদেরকে সাহায্য করেন।

এরপর আম্মাজান হযরত রসূলুল্লাহ (স.) কে সাথে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই অরাকা ইবনে নাওফিল (ইবনে আছাদ ইবনে আবদিল উযযা ইবনে কুসাই) এর নিকট গেলেন।  জাহিলিয়াতের যুগে তিনি খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।  তিনি আরবীতে কিতাব লিখতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছা মাফিক আরবীতে ইঞ্জিলের অনুবাদ করতেন।  তিনি খুব বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।  হযরত খাদিজা (রা.) তাকে বললেন আপনার ভাতিজা কী বলে শোনেন।  অরাকা হযরত রসূলুল্লাহ (স.)কে বললেন, ভাতিজা! আপনি কী দেখেছেন? হযরত রসূলুল্লাহ (.) তার কাছে সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত বললেন।  অরাকা ঘটনা শুনে বললেন, ইনিতো নামুস-যিনি আল্লাহ প্রেরিত পয়গাম নিয়ে হযরত মুছা (আ.) এর কাছে আসতেন।  হায়! আপনার স্বজাতিরা যখন আপনাকে বের করে দিবে তখন যদি আমি যুবক থাকতাম! (তবে কতই না আমি সৌভাগ্যশালী হতাম) হযরত রসূলুল্লাহ (স.) তার কথা শুনে বললেন, আমার স্ব জাতিরা আমাকে বের বরে দিবে! অরাকা বললেন, হ্যাঁ শুধু আপনাকেই নয় বরং আপনার মত যারাই এই নবুয়াত লাভে ধন্য হয়েছিলেন তাদের সাথেও এরূপ শত্রুতা করা হয়েছিল।  আচ্ছা, আমি যদি ঐ পর্যন্ত বেঁচে থাকি তবে আমি আপনাকে সাহায্য করব।  এই ঘটনার পরে অরাকা অল্প কিছু দিন বেঁচে ছিলেন।  দীর্ঘ সময়ের জন্যে অহী আসা বন্ধ হয়ে গেল।  এতে রসূলুল্লাহ (স.) ভীষণ চিন্তা যুক্ত হয়ে গেলেন। {বুখারী শরীফ, হাদীছ নং ৪৯৫৩, (ই.ফা. ৪৫৯০)}

(অন্য এক ছনদে) মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব আবু ছালামা ইবনে আবদুর রহমান (রা.) এর মাধ্যমে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন।  হযরত রসূলুল্লাহ (স.) অহী বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে বলেছেন, এক সময় আমি পথ চলছিলাম।  হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম।  আমি মাথা তুলে তাকালাম। দেখলাম, যে ফেরেশতা আমার কাছে হিরা গুহায় আসতেন তিনিই আসমান ও যমীনের মাঝখানে স্থাপন করা কুরছীতে বসে আছেন। এতে আমি ভয় পেয়ে গেলাম।  বাড়ি ফিরে বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর।  সুতরাং সকলেই আমাকে বস্ত্রাবৃত করল।  তখন আল্লাহ তায়ালা নাযিল করলেন, হে বস্ত্রাবৃত! আপনি ওঠেন, সতর্কবাণী প্রচার করেন এবং আপনার প্রতিপালকের বড়ত্ব ঘোষণা করেন।  আপনার পোষাক পবিত্র রাখেন এবং অপবিত্রতা হতে দূরে থাকেন।  আবু সালামা বলেন আরবরা জাহিলী যুগে সে সব মুর্তির পুজা করত الرُّجْزَ বলে ঐ সব মুর্তিকে বোঝানো হয়েছে।  বর্ণনাকারী বলেন এরপর থেকে অহীধারা অব্যাহত থাকে। {বুখারী শরীফ, হাদীছ নং ৪৫৯০ ই.ফা.}

বুখারী শরীফের আরেকটি হাদীছের বর্ণনানুযায়ীঃ

এদিকে অহী আসাও (নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্যে) বন্ধ হয়ে যায়। (কোন বর্ণনায় এসেছে এই বিরতীকাল ছিল আড়াই বছর আবার কিছু বর্ণনায় এসেছে তিন বছর) ফলে নবী কারীম (স.) মানসিক অস্থিরতার মধ্যে দিন অতিবাহিত করছিলেন।  কয়েকবার তিনি পাহাড়ের চুড়া থেকে নিজেকে ফেলে দিতে চেয়েছিলন কিন্তু প্রত্যেকবারই হযরত জীব্রাইল (আ.) এসে বলতেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ তায়ালার সত্য নবী”।  এটাতে নবী কারীম (স.) আশ্বস্ত হতেন এবং মানুষিক অস্থিরতা প্রশমিত হত।  তিনি ইতমিনানের সাথে বাড়ি ফিরে আসতেন। {হাদীছ নং ৬৯৮২ (আরবী)}

কুরআনের নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে এই কয়টি আয়াত সর্ব প্রথম নাযিল হয়।  যদিও প্রথম নাযিলকৃত আয়াত নিয়ে মতভেদ আছে কিন্তু এটিই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত যে, সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াতই হল প্রথম অবতীর্ণ আযাত।

নিজ বান্দার প্রতি এটাই ছিল আল্লাহ তায়ালা প্রথম নিয়ামাত ও পরম করুনাময়ের প্রথম রহমাত।

এই ছিল প্রথম নাযিলকৃত আয়াতসমূহের প্রেক্ষাপট।  এখনও পর্যন্ত নবুয়াতের কথা প্রকাশ হয়নি।  অরাকা ইবনে নাওফিল তাঁর সম্পর্কে কয়েকটি কথা হযরত খাদিজা (রা.) কে বললেন মাত্র।  সাথে সাথে অরাকার কিছু মনোবাঞ্চা প্রকাশ করলেন।  অরাকা ইবনে নাওফিলের কাছে হযরত রসূলুল্লাহ (স.) নিয়ে আসার আগে উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদিজা (রা.) হযরত রসূলুল্লাহ (স.) কে যে শান্তনা দিয়েছিলেন তার ভাব গাম্ভীর্যতা ও শিক্ষা বড় গভীর চিন্তার উদ্রেক করে।  তখনও নবুয়াতী শিক্ষা বিস্তার লাভ করেনি।  কিন্তু তিনি (রা.) তাকে অভয় শুনালেন যে, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে অপদস্ত করবেন না।  আপনার ধ্বংস আসতেই পারে না, আপনার জন্য অশুভ কিছু উকি দিতে পারে না।  তিনি বললেন, كَلَّا أَبْشِرْ فَوَاللَّهِ لَا يُخْزِيكَ اللَّهُ أَبَدًا  “কখনই নয় (বরং) আপনি শুভ সংবাদ শোনেন, আল্লাহর কছম! আল্লাহ আপনাকে কখনই লাঞ্চিত করবেন না”।

কারণ হিসাবে বললেনঃ

إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وتَصْدُقُ الْحَدِيثَ، وَتَحْمِلُ الكَلَّ، وَتُقْرِي الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبَ الْحَقِّ

আপনি (১) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন অর্থাৎ আপনি আপনার আত্মীয় স্বজনের প্রতি কর্তব্য পালন করে থাকেন (২) সদা সত্য কথা বলেন (৩) অপরের বোঝা বহন করেন অর্থাৎ অনাথ, দূর্বলদেরকে সাহায্য করেন (৪) মেহমানের সেবা করেন (৫) সত্যের পথে অন্যদেরকে সাহায্য করেন।

আমাদের জন্য শিক্ষা হল, যদি কোন মানুষের মধ্যে এই গুণাবলীগুলো পাওয়া যায় তবে আশা করা যায় তার জন্য ধ্বংস নয় বরং সফলতা আসবে।  অশুভ নয় বরং শুভ পরিণতি তার জন্য অপেক্ষা করবে।  আল্লাহই সর্ব বিষয়ে অধিক জ্ঞাত।

আরেকটি শিক্ষা হল, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব বোধ কী? কী দেখালেন আমাদের আম্মাজান (রা.)? শুধুই কি সংসার? না বরং স্বামীকে শান্তনা, সৎ পরামর্শ এবং অভিভাবকত্বও স্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে।  কিন্তু তারজন্য প্রয়োজন আমাদের আম্মাজান (রা.) এর মত সতী সাদ্ধী, নেক, হিকমাতওয়ালী নারী।  যার জন্য প্রয়োজন বিয়ের আগেই কুরআন ও হাদীছের আলোকে নেক পাত্রি খোঁজা ও ইছলামী পদ্ধতিতে সংসার পরিচালনা করা।

এবার আসা যাক প্রথম অবতীর্ণ ঐ পাঁচটি আয়াত কী ছিল এবং তার মধ্যে আমাদের জন্যে কী শিক্ষা আছে সে বিষয়ে।

প্রথম অবতীর্ণ পাঁচটি আয়াতঃ

اِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (১) خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ (২) اِقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ  (৩) اَلَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ (৪) عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ (৫) — سورة العلق

অনুবাদঃ (১) পাঠ করুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। (২) সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।  (৩) পাঠ করুন, আর আপনার রব মহা দয়ালু।  (৪) যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। (৫) শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।  (সূরা আলাক)

প্রথম আয়াতঃ এই আয়াতে রসূলুল্লাহ (স.) কে আল্লাহর নামে পড়তে বলা হয়েছে।  এটাই হযরত রসূলুল্রাহ (স.) এর প্রতি আল্লাহ তায়ালার প্রথম খিতাব।  আর এর মধ্যে আছে পড়া, লেখা ও ইলমের প্রতি দাওয়াত।  শিক্ষা আছে কুরআন “বিছমিল্লাহির রহমানির রহীম” বলে শুরু করার আদব।

দ্বিতীয় আয়াতঃ এই আয়াতের মধ্যে মানব সৃষ্টির স্তর বর্ণিত হয়েছে।

তৃতীয় আয়াতঃ এই আয়াতটি প্রথম আদেশের তাকীদ।  এখানে তাবলীগের গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।

চতুর্থ আয়াতঃ

الَّذِيْ عَلَّمَ بِالقَلَمِ  মানব সৃষ্টির পর মানব শিক্ষা বর্ণিত হয়েছে। কারণ, শিক্ষাই মানুষের অন্যান্য জীবজন্তু থেকে স্বতন্ত্র এবং সৃষ্টির সেরা রূপে চিহ্নিত করে। শিক্ষার পদ্ধতি সাধারণত বিবিধ। এক. মৌখিক শিক্ষা এবং দুই. কলমও ও লেখার মাধ্যমে শিক্ষা।

সূরার শুরুতে  اقْرَأْ  শব্দের মধ্যে মৌখিক শিক্ষা রয়েছে। কিন্তু এ আয়াতে শিক্ষাদান সম্পর্কিত বর্ণনায় কলমের সাহায্যে শিক্ষাকেই অগ্রে বর্ণনা করা হয়েছে।

শিক্ষার সর্ব প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ উপায় ও লিখনঃ হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-র এক রেওয়ায়েতক্রমে রসূলুল্লাহ (সা.) বলেনঃ

لَمَّا خَلَقَ اللهُ الخَلْقَ كَتَبَ فِي كِتَابِهِ فَهُوَ عِنْدَهُ فَوْقَ العَرْشِ أَنَّ رَحْمَتِيْ غَلَبَتْ غَضَبِي

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যখন আদিকালে সবকিছু সৃষ্টি করেন, তখন আরশে তাঁর কাছে রক্ষিত কিতাবে একথা লিপিবদ্ধ করেন যে, আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রবল থাকবে। হাদীসে আরও বলা হয়েছেঃ

أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللهُ القَلَمَ فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ فَكَتَبَ مَا يَكُوْنُ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ فَهُوَ عِنْدَهُ

অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং তাকে লেখার নির্দেশ দেন। সেমতে কলম কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে, সব লিখে ফেলে। এ কিতাব আল্লাহর কাছে আরশে রক্ষিত আছে।  (কুরতুবী)

 অংকন ও লিখন আল্লাহর বড় নিয়ামতঃ হযরত কাতাদাহ (র) বলেন, কলম আল্লাহ তা’আলার একটি বড় নিয়ামত। কলম না থাকলে কোন ধর্ম প্রতিষ্ঠিত থাকত না এবং দুনিয়ার কাজকারবারও সঠিকভাবে পরিচালিত হত না। হযরত আলী (রা) বলেনঃ এটা আল্লাহ তা’আলার একটা বড় কৃপা যে, তিনি তাঁর বান্দাদেরকে অজ্ঞাত বিষয়সমূহের জ্ঞান দান করেছেন এবং তাদেরকে মূর্খতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর দিকে বের করে এনেছেন। তিনি মানুষকে লিখন-বিদ্যায় উৎসাহিত করেছেন। কেননা, এর উপকারিতা অপরিসীম। আল্লাহ ব্যতীত কেউ তা গণনা করে শেষ করতে পারে না। যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান, পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের ইতিহাস, জীবনালেখ্য ও উক্তি আল্লাহ তা’আলার অবতীর্ণ কিতাবসমূহ সমস্তই কলমের সাহায্যে লিখিত হয়েছে এবং পৃথিবীর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অক্ষয় হয়ে থাকবে। কলম না থাকলে ইহকাল ও পরকাল সব কাজকর্মই বিঘ্নিত হবে।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলিমগণ সর্বদা লিখন কর্মের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁদের অগণিত রচনাশৈলীই এর উজ্জল সাক্ষ্য বহন করে। পরিতাপের বিষয়, বর্তমান যুগে আলিম ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি চরম উদাসীনতা বিরাজমান রয়েছে। ফলে শত শত লোকের মধ্যে দু’চারজনই এ ব্যাপারে পণ্ডিত দৃষ্টিগোচর হয়।

রসূলুল্লাহ (সা)-কে লিখন শিক্ষা না দেওয়ার রহস্যঃ আল্লাহ তা’আলা শেষ নবী (স.)-র মর্যাদাকে মানুষের চিন্তা ও অনুমানের উর্ধ্বে রাখার জন্য তাঁর জন্মস্থান থেকে ব্যক্তিগত অবস্থা পর্যন্ত সব কিছুকে এমন করেছেন যে, কোন মানুষ এসব ব্যাপারে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও শ্রম দ্বারা কোন উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে না। তাঁর জন্মস্থানের জন্য আরবের মরুভূমি মনোনিত হয়েছে, যা সভ্য জগৎ ও জ্ঞান-গরিমার পাঠভূমী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল এবং পথ ও যোগাযোগের দিক দিয়ে অথ্যধিক দুর্গম ছিল। ফলে শাম, ইরাক, মিসর ইত্যাদি উন্নত নগরীর অধিবাসীদের সাথে সেখানকার লোকদের কোন সম্পর্ক ছিল না। এ কারণেই আরবের সবাই উম্মী বলে কথিত হয়। এমন দেশ ও গোত্রের মধ্যে জন্ম গ্রহণের পর আল্লাহ তা’আলা আরও কিছু ব্যবস্থা করলেন। তা এই যে, আরবদের মধ্যে যদিও বা খুব নগণ্য সংখক লোক জ্ঞান-বিজ্ঞান, অঙ্কন ও লিখন বিদ্যা শিক্ষা করত, কিন্তু রসূলুল্লাহ (স) কে তা শিক্ষা করারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। এহেন প্রতিকুল পরিবেশে জন্ম গ্রহণকারী ব্যক্তির কাছ থেকে কে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও উন্নত চরিত্র আশা করতে পারত? হঠাৎ আল্লাহ তা’আলা তাঁকে নবুয়াতের অলংকারে ভূষিক করলেন এবং জ্ঞান প্রজ্ঞার এক অশেষ ফল্গুধারা তাঁর মুখ দিয়ে প্রবাহিত করে দিলেন। বিশুদ্ধতায় ও প্রাঞ্জলতায় আরবের বড় বড় কবি ও অলংকারবিদও তাঁর কাছে হার মেনে যায়। এই প্রোজ্জল মো’জেযাটি স্বচক্ষে দেখে এ প্রত্যয় না করে উপায় নেই যে, তাঁর এসব গুন-গরিমা মানবীয় প্রচেষ্টা ও কর্মের ফলশ্রুতি নয় বরং আল্লাহ তা’আলার অদৃশ্য দান। অংকন ও লিখন না দেওয়ার মধ্যে এ রহস্যই নিহিত ছিল। (কুরতুবী) (তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআ।। অষ্টম খণ্ড – পৃষ্ঠা: ৮২৪-৮২৬।

তাফছীরের সারসংক্ষেপঃ

জমাট রক্তের মধ্যে নিজের অসীম রহমতে সুন্দর চেহারা দান করেছেন। তারপর নিজের বিশেষ রহমাতে জ্ঞান দান করেছেন এবং বান্দা যা জানতো না তা শিক্ষা দিয়েছেন। জ্ঞানের কারণেই আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) সমস্ত ফেরেশতার মধ্যে বিশেষ সন্মান লাভে সমর্থ হয়েছেন। জ্ঞান কখনো মনের মধ্যে থাকে কখনো মুখের মধ্যে থাকে এবং কখনো কিতাবের মধ্যে লিখিত ভাবে বিদ্যমান থাকে। কাজেই জ্ঞান যে তিন প্রকার তা প্রতীয়মান হয়েছে। অর্থাৎ মানসিক জ্ঞান, শাব্দিক জ্ঞান এবং রসমী জ্ঞান। মানসিক এবং শাব্দিক জ্ঞানের জন্য রসমী জ্ঞান প্রয়োজন। কিন্তু রসমী জ্ঞানের জন্যে এ দুটি জ্ঞান না হলেও চলে। এ কারণেই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’য়ালা স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেন, তুমি পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না।

একটি আসারে রয়েছেঃ “জ্ঞানকে লিখে নাও। যে ব্যক্তি নিজের অর্জিত জ্ঞানের উপর আমল করে আল্লাহ তা’আলা তাকেই সেই জ্ঞানেরও ওয়ারিস করেন যা তার জানা ছিল না।

 

5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Md Ismail Husain
3 months ago

الحمدلله

Yousuf
3 months ago

We are very happy

Tajul islam
Tajul islam
2 months ago

جزاكم الله تعالى احسن الجزاء

Nayema
1 month ago

এই রকম পোষ্ট আরো পেতে চাই।

Comment here