কুরআনতাফছীর

মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরন করো না

35 বার পড়া হয়েছে।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلا تَمُوتُنَّ إِلا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ (102)

অনুবাদঃ

হে ঈমানদারগণ আল্লাহ তায়ালাকে যেভাবে ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাকো আর মুছলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।  (সূরা আল ইমরান, আয়াত নং ১০২)

তাফছীরের সারাংশ কথাঃ মুয়াচ্ছার

যারা আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলের উপর ঈমান এনেছো ও তাঁদেরকে সত্যায়ন করেছো আর সাথে সাথে শরীয়তের উপর আমাল করেছো তারা আল্লাহ তায়ালাকে যেভাবে ভয় করা উচিত সেভাবে ভয় করো। তার পদ্ধতি হল, সর্বদা আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করবে কখনও তাঁর অবাধ্য হবে না, সর্বদা শুকরিয়া আদায় করবে কখনও অস্বীকার কারী হবে না। সর্বদা তাঁর স্মরণ করবে কখনও তাঁকে ভুলে যাবে না। জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ইছলামকে আকড়ে থাকবে আর এভাবেই তাঁর সাথে সাক্ষাত করবে।  (তাফছীরে মুয়াচ্ছার)

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারগণকে দু’টি আদেশ দিয়েছেন। (১) হক আদায় করে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করা, (২) মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ না করা।

 

যে বিষয়গুলো আমাদেরকে জানতে হবেঃ (১) তাকওয়া কাকে বলে? হক পূরণ করে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করা কাকে বলে ও তার পরিব্যাপ্তি কতটুকু।

(২) মৃত্যু দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্রই আল্লাহ তায়ালার করায়াত্বে। কোন মাখলুকের এখানে কোন ক্ষমতাই নেই। তারপরও বলা হয়েছে, “তোমরা মৃত্যুবরণ করো না” তাহলে এই কথার অর্থ কী?

 

তাকওয়া কাকে বলে? (আভিধানিক, পারিভাষিক ও শরীয়ী অর্থে)

আভিধানিক অর্থে তাকওয়া অর্থ সতর্কতা, সাবধানতা, ভয়, শঙ্কা, সজাগ অবস্থা। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, هُوَ أَهْلُ التَّقْوَى وَأَهْلُ الْمَغْفِرَةِ (سورة المدثر، الآية: ৫৬) অর্থাৎ একমাত্র তিনিই (আল্লাহ) ভয়ের যোগ্য ও ক্ষমার অধিকারী। এ কথাকে এভাবে বলা যায় যে, তাঁর শাস্তিকেই ভয় করার মত আর তিনিই ক্ষমা করার একমাত্র অধিকারী।

শরীয়ী অর্থঃ তাকওয়া কথাটা মূলত শরীয়াতের একটি বিশেষ পরিভাষা। যার সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার অনেক হুকুম আহকাম, বান্দার পুরষ্কার জড়িত।  তাকওয়া বলতে বোঝায় আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করা। এটাকে এভাবে বলা যায়, বান্দা আল্লাহ তায়ালার রাগ, অসন্তুষ্টি, শাস্তিকে ভয় করবে ও এগুলো থেকে বেঁচে থাকবে।  এটা সম্পাদন করবে এভাবে যে, বান্দা সদা সর্বদা সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করবে এবং কোন অবস্থাতেই কোন ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতা করবে না অর্থাৎ কোন প্রকার গোনাহ করবে না।  (জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ইবনে রজব প্রণিত, ১/৩৯৮, জামিউল বয়ান ইবনে জারীর প্রণিত, ২/১৮১)

 

হযরত তালাক ইবনে হাবীব (র.) বলেন, তাকওয়া হল, সওয়াবের আশায় আল্লাহ তায়ালার কুদরাতী আলোয় তাঁর পূর্ণ আনুগত্য করা। আর আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমাতে তাঁর আযাবের ভয়ে গোনাহকে ছেড়ে দেওয়া।  (জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম ইবন রজব প্রণিত, ১/৪০০)

 

পূর্ণ তাকওয়া হল, সকল প্রকার ফরয ও ওয়াজিবগুলো আদায় করা ও সকল প্রকার হারাম (নিষিদ্ধ বিষয়গুলো) ও সন্দেহজনক বিষয়গুলো ত্যাগ করা। তাকওয়ার মধ্যে সকল মুস্তাহাব কাজ সম্পাদন করা ও সকল প্রকার মাকরূহ কাজগুলো ছেড়ে দেওয়াও অন্তর্ভুক্ত।  এটাকে উপরের স্তরের তাকওয়া বলা হয়। (গ্রাগুক্ত)

 

বিশিষ্ট জলীল কদর সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাছউদ (রা.)   اتَّقُواْ الله حَقَّ تُقَاتِهِআয়াতের তাফছীর প্রসঙ্গে বলেন, তাকওয়া হল, আনুগত্য করা, কখনও অবাধ্যতা না করা, সর্বদা আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করা কখনও তাঁকে ভুলে না যাওয়া, সর্বদা আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করা কখনও অস্বীকার না করা। (মুছতাদরাকে হাকিম, হাদীছ নং ৩১৫৯) হাদীছের ছনদটি সহীহ। এই হাদীছের সকল রাবী বুখারী ও মুছলিমের শর্তে উত্তীর্ণ। এই সংজ্ঞাকে সকলেই অধিক গ্রহণ করে থাকেন।  (ইমাম তাবারানী প্রণিত আলমুজামুল কাবীর, ৯/৯২, হাদীছ নং-৮৫০২, মুসতাদরাকে হাকিম, ২/২৯৪)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাছউদ (রা.)কৃত তাকওয়ার এই সংজ্ঞাকে হযরত হাফিয ইবনে রজব (র.) এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, শোকরের অর্থ হল, আল্লাহ তায়ালাকে সকল প্রকার আনুগত্য করা। “সর্বদা তাঁর স্মরণ করো কখনও তাঁকে ভুলে যেও না” এর অর্থ হল, সুখে দুখে, শান্তিতে অশান্তিতে সর্ব হালতে আল্লাহ তায়ালার সকল আদেশগুলোকে আন্তরিকতার সাথে আদায় করা। একইভাবে সর্ব হালতে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা কখনই সেগুলো না করা এমনকি তার পাশেও না যাওয়া।  (জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ১/৪০১)

ইমাম কুরতুবী (র.) একটি উসূল উল্লেখপূর্বক বলেন যে, “হক আদায় করে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো” এর অর্থ হল তোমাদের পুরা সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো। এর সমর্থনে তিনি এই আয়াত উল্লেখ করেছেন, فاتَّقُوا الله مَا اسْتَطَعْتُمْ

(আল জামি’ লি আহকামিল কুরআন ইমাম কুরতুবী প্রণিতঃ ৪/১৬৬)

তাকওয়া সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) প্রশ্নকারীকে বলেন, তুমি কি কখনও কাটাযুক্ত পথে চলেছো? প্রশ্নকারী বললেন, হ্যাঁ।  আবু হুরাইরাহ (রা.) বললেন, তুমি কিভাবে সে পথে চলো? তিনি বললেন, যখন কাঁটাময় রাস্তা দেখি তখন নিজেকে সংকোচিত, জড়োসড়ো করে নেই অথবা রাস্তাকে এড়িয়ে চলি অথবা চলাকে সীমিত করে ফেলি।  হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) বললেন, এটাই তাকওয়া।  (জামিউল উলূমি ওয়ালা হিকাম ইবনে রজব প্রণিত ১/৪০২)

 

বিস্তারিত কথাঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে যথাযথভাবে, পূর্ণ হক আদায় করে, তাকওয়ার সকল শর্তগুলো বজায় রেখে ভয় করো। এই আয়াত নাযিল হলে সাহাবা (রা.) খুব ভীত হয়ে গেলেন। তাঁদের মনের মধ্যে এই শংকা আর ভয় আচ্ছন্ন হয়ে গেল যে, এটাতো আমাদের দ্বারা সম্ভব নয় কাজেই আমাদের দ্বারা আল্লাহ তায়ালার এই আদেশ পালন করা সম্ভব হবে কেমন করে। আমরাতো সেটা আদায় করতে একেবারেই অক্ষম।  সাহাবা (রা.) গণ আল্লাহ তায়ালার প্রতি শ্রদ্ধামাখা ভয়ে ভীত ছিলেন এবং প্রতিটি আদেশ পালনে তাঁরা বড় বেশি সজাগ ছিলেন। এই জন্য মূলত তাদের মধ্যে এত বেশি চিন্তা, ভয় প্রকট আকার ধারণ করেছিল। (আল্লাহ সর্ববিষয়ে অধিক জ্ঞাত)

এরপর যখন فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ  অর্থাৎ তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো।  (সূরা তাগাবুন ১৬)

আয়াত নাযিল হল তখন তাদের মধ্য থেকে চিন্তার রেখা দূর হয়ে গেল।

দু’টি আয়াতের মিলিত অর্থ এটা হতে পারে যে, হে ঈমানদারগণ তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো। সকল শক্তি ব্যয় করে, পুরাপুরি চেষ্টা সহকারে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করাই হল হক আদায় করে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করা।

 

লেখাটির বাকি অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

 

Comment here